আমের রাজকীয় দস্তরখানে আপনাকে স্বাগত!

আগের মতো আম কেন এখন পাওয়া যায় না? – গুণমানের হ্রাস এবং এর কারণসমূহ

আম আমাদের দেশের অন্যতম জনপ্রিয় এবং পুষ্টিকর ফল, যার সিজনাল আস্তানায় মানুষ প্রতি বছর অপেক্ষা করে থাকে। তবে, গত কয়েক বছরে লক্ষ্য করা গেছে যে আগের মতো বা ঐতিহ্যবাহী স্বাদ, গন্ধ এবং গুণমানের আম পাওয়া যাচ্ছে না। বিভিন্ন কারণে এই পরিবর্তন এসেছে। নিচে আমরা জানবো কেন আগের মতো আম এখন পাওয়া যায় না।


১. পরিবেশগত পরিবর্তন:

বিশ্বজুড়ে পরিবেশগত পরিবর্তনগুলি ফলের উৎপাদন এবং মানের উপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে, আবহাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তন আমের উৎপাদনে একটি বড় ভূমিকা পালন করে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং দীর্ঘ খরা আমের ফলন ও গুণমানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই পরিবর্তনের ফলে ফলের গুণমান কমে যাচ্ছে এবং স্বাদ ও আকারেও পরিবর্তন আসছে।


২. মাটি ও জমির অবক্ষয়:

আমের চাষের জন্য বিশেষ ধরনের মাটি প্রয়োজন, তবে আজকাল অনেক কৃষকরা আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম সার ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছেন। এটি মাঝে মাঝে মাটির প্রাকৃতিক গুণাগুণ এবং পুষ্টি উপাদানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এছাড়া, অতিরিক্ত রাসায়নিক সারের ব্যবহার এবং পেস্টিসাইডের অতিরিক্ত প্রয়োগ আমের গুণমান ও স্বাদকে প্রভাবিত করতে পারে।


৩. অপ্রয়োজনীয় জাতের আমের আধিক্য:

বর্তমানে উন্নত জাতের আম যেমন “অল রেড” বা “ফজলি” বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই জাতগুলো বাজারে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও তাদের স্বাদ, গন্ধ বা পুষ্টিগুণ পুরোনো ঐতিহ্যবাহী জাতের তুলনায় অনেকাংশে কম। পাশাপাশি, বিশেষ ধরনের আমের চাষ কমে গেছে, যেমন খিরসাপাত, সাদাবাগ, অথবা অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী জাতগুলি কম চাষ হচ্ছে, কারণ উৎপাদন বেশি হলে বাণিজ্যিকভাবে লাভ অনেক বেশি হতে পারে।


৪. অত্যধিক বাণিজ্যিকীকরণ:

আজকাল, আম চাষে বাণিজ্যিকিকরণের প্রভাব অনেক বেড়েছে। অনেক কৃষক কেবল লাভের জন্য উচ্চ ফলনশীল এবং দ্রুত পরিপক্ক জাতের আম চাষ করে, যা কখনো কখনো গুণমানে কম হতে পারে। বাজারের চাহিদা পূরণের জন্য কৃষকরা সেগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর দিকে মনোযোগী, কিন্তু এর ফলে স্বাদ বা গুণগত মান প্রভাবিত হচ্ছে।


৫. চাষির জ্ঞানের অভাব:

আগে কৃষকরা পারিবারিক ও ঐতিহ্যগত চাষ করতেন, যা অনেক বছর ধরে স্থানীয়ভাবে প্রমাণিত ছিল। তবে এখন নতুন চাষিরা আধুনিক চাষ প্রযুক্তি অনুসরণ করার কারণে, ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে আম চাষের অভাব দেখা যাচ্ছে। এর ফলে, আমের পুরোনো স্বাদ ও গুণমানের হ্রাস ঘটছে।


৬. ভেজাল এবং কেমিক্যালের ব্যবহার:

আমের স্বাদ এবং গুণমান উন্নত করতে অনেক চাষি অতিরিক্ত কেমিক্যাল এবং রিপেনিং এজেন্ট ব্যবহার করে থাকেন, যা আমের স্বাদ ও পুষ্টির ক্ষতি করে। এছাড়া, আমের অল্প বয়সে পাকানোর জন্য বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার, যা আমাদের শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, তা স্বাভাবিকভাবে ফলের গুণগত মান কমিয়ে দেয়।


৭. নগরায়নের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি অঞ্চল:

নগরায়ন এবং জমির বৈষম্য বৃদ্ধির কারণে, অনেক কৃষক জমি হারাচ্ছেন। এক্ষেত্রে ঐতিহ্যবাহী ফলের চাষ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং ধীরে ধীরে আমের চাষেও পরিবর্তন আসছে। শহরের প্রসার ও অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে আম চাষের জন্য আরও কম জমি ব্যবহার করা হচ্ছে।


৮. আমের পরিবহণ এবং স্টোরেজ সমস্যা:

প্রযুক্তির অভাবে বা যথাযথ স্টোরেজ পদ্ধতি না থাকার কারণে অনেক সময় আম সঠিকভাবে সংরক্ষিত হয় না এবং এর ফলে গুণমান হ্রাস পায়। চাহিদার ওপর ভিত্তি করে দূরবর্তী স্থানগুলোতে আম পাঠানোর সময় এতে স্বাদ এবং গুণমানের হ্রাস হতে পারে।


উপসংহার:

অতীতে আমরা যে ধরনের আম খেতাম, তা আজকাল আর পাওয়া যায় না। বর্তমান সময়ে অনেক পরিবর্তন এসেছে যেগুলোর প্রভাব আমের গুণমান, স্বাদ এবং উৎপাদনে পড়েছে। তবে, কৃষকদের যদি সঠিক প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তি সরবরাহ করা হয়, তাহলে হয়তো এই সমস্যাগুলি কিছুটা দূর করা সম্ভব। পাশাপাশি, আমের প্রাকৃতিক স্বাদ ও গুণমান বজায় রাখতে প্রাকৃতিক এবং পরিবেশবান্ধব চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করা প্রয়োজন।

আমের প্রকৃত স্বাদ এবং গুণমান ফিরে পেতে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে, এবং ঐতিহ্যবাহী আম চাষের গুরুত্ব বুঝতে হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top